শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০৩:৩৮ অপরাহ্ন

মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণ ’আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ’

মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিচারণ ’আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ’

0 Shares

৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। পাক হানাদার বাহিনী এবং এদেশের স্বাধীনতা বিরোধী দোশরদের হাতে সমভ্রমহানী ঘটে দু’লক্ষ মা বোনের ইজ্জত। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিশে^র দ্বিতীয় আর কোন দেশ এত ত্যাগ আর রক্ত দিয়েছেন বলে জানা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে দেশকে শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করতে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাক বাহিনীদের পরাজিত করে লাল সবুজের পতাকা খচিত বিজয় ছিনিয়ে আনে বাঙ্গালী জাতি।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের সময় রনাঙ্গনের নানা স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী উপজেলার মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের যুদ্ধকালীন কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আব্দুল লতিফ। মুক্তিযুদ্ধের এ স্মৃতিচারণ মুলক স্বাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছেন সাংবাদিক জে আই লাভলু…
১। প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের ব্যাপারে আপনি কিভাবে অনুপ্রাণীত হলেন?
উত্তর: এদেশে যখন পাক বাহিনী গনহত্যা শুরু করল তখন চোখের সামনে দেখে এগুলো দেখে আর বসে থাকতে পারলাম না। চিন্তা করলাম আমাদেরকেই দেশটাকে বাচাঁতে হবে। ঝাপিয়ে পড়তে হবে যুদ্ধে। এদেশের নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের উপর পাক সেনাদের অত্যাচার যত বাড়তে থাকে আমরাও শহর-বন্দর, গ্রাম গঞ্জ আর পাড়া-মহল্লায় একে একে তত সংগঠিত হতে থাকি। ১৯৭১ সালে আমি খুলনা আজমখান কমার্স কলেজের আইকমের পরীক্ষার্থী ছিলাম। তখন দিনটি ছিল ৩রা মার্চ। পাক বাহিনী হঠাৎ কলেজের আশপাশে আক্রামণ চালায়। এসময় তারা ১৪ জন ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করে। এসময় তাদের গুলিতে আরো ১৭ জন কমবেশি আহত হন। এ বিষয়টি আমাকে তখন বেশ নাড়া দিয়েছিল। তখন ২৫ মার্চ পর্যন্ত আমরা সংঘবদ্ধ হয়ে খুলনার বিভিন্ন রাস্তায় বেড়িগেট সৃস্টি করি এবং গাছ কেটে রাস্তা আটকে দিই। যাতে করে ওরা বিভিন্ন এলাকায় না ঢুকতে পারে। ঐ ঘটনার পর থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধে যাওযার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নেই।
২। প্রশ্ন: কার ডাকে সারা দিয়ে আপনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেছেন:
উত্তর: মূলত ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণই ছিল স্বাধীনতার সূতিকাগার। তিনি সেদিন বলেছিলেন, যার যা আছে তাই নিয়ে আমাদেরকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। তার ডাকেই সাড়া দিয়ে সেদিন ছাত্র- জনতা মুক্তিযুদ্ধের জন্য ঝাপিয়ে পড়ে। আমিও সেদিন তার ডাকে সাড়া দিয়ে চূড়ান্ত ভাবে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ি।
৩। প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য আপনি কোথায় ট্রেনিং নিয়েছেন:
উত্তর: মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের জন্য আমি সুন্দরবন হয়ে প্রথমে ভারতে প্রবেশ করি। ভারতের বসিরহাটের হাসনাবাদের আমলানি ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিই। মঠবাড়িয়ার সেনা অভিসার এম এন এ ছগির তখন আমাদের ট্রেণিং দিত। এরপর পিথা ক্যাম্প এবং বিরভুমেও একটি ক্যাম্পে কয়েক মাস ধরে প্রশিক্ষন নিই। ওখানে ট্রেনিংরত অবস্থায় মেজর এম এ জলিলের নির্দেশে আমাদের কয়েকটি বিচ্চু বাহিনী গ্রæপ রাতে বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করত। তারা যশোর,সাতক্ষীরার আশপাশ এলাকায় পাক সেনাদের ঘাঁটি সনাক্ত করত এবং তাদের গতিবিধি জানত। এরপর পরে আমরা মেজর এম এ জলিলের নেতৃত্বে বেশি সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ঐসব পাকসেনা ঘাঁটিতে আক্রমণ করার প্রস্তুতি নিতাম এবং তাদেরকে হটাতে সক্ষম হতাম।
৪। প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি কি কোন সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছেন কিনা ?
উত্তর: হাঁ, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেছি। আমি তখন খুলনা আজমখান কমার্স কলেজের ছাত্র ছিলাম। তখন বিশ^বিদ্যালয় এবং কলেজের ছাত্ররাই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য বেশি আগ্রহী ছিল। দেশের প্রতি তাদের মমত্ববোধ এবং শক্ত মনোবল থাকায় যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে তারা কোন দ্বিধাবোধ করতনা। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনের জন্য আমি সবাইকে অনুপ্রানীত করতাম। আমরা একে একে সংগঠিত হওয়ার জন্য দাওয়াত দিতাম। আমার আহবানে সেসময় অনেক ছাত্র যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। আমরা ঐ সময়ে সংগঠিত হয়ে খুলনা থেকে ৪১ জনের একটি দল সুন্দরবনের বগি যাওয়ার উদ্যেশ্যে রওনা হই। কিন্তু পথে বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনীদের বাধার মুখে পড়ে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। এরপর আমরা একসাথে মাত্র ১২ জন সুন্দরবনে পৌছাই। ওখান থেকে ট্রেনিংয়ের জন্য আমরা ভারতে চলে যাই।
৫। প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের জন্য কারা বেশি অনুপ্রানীত হত ?
উত্তর: মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহনের জন্য ছাত্র এবং যুবকরা বেশি অনুপ্রানীত হত।
৬। প্রশ্ন: আপনি সরাসরি কোন যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেছেন কিনা:
উত্তর: হাঁ, আমি সরাসরি রনাঙ্গনের একজন যোদ্ধা। একাধিক যুদ্ধে আমি অংশ গ্রহন করেছি। এরমধ্যে যশোরের একটি রাজবাড়িতে অবস্থানরত পাক সেনাদের ঘাঁটিতে ৯নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিলের নির্দেশে আমরা রাতে ইন্ডিয়া থেকে বর্ডার পার হয়ে প্রায় ৩০০ জনের একটি মুক্তিবাহিনীর দল নিয়ে নভেম্বরের শেষের দিকে ৩০শে রমজান রাতে আক্রমণ করি। রাত ১২টায় আমরা আক্রমণ শুরু করি এবং শেষ হয় ভোর ৫টায়। আমাদের মুক্তি বাহিনীদের হামলায় প্রায় ৩ শতাধিক পাক সেনা ও রাজাকারদের মধ্যে অনেকেই নিহত হন। আমাদেরও তখন ৭/৮ জন মুক্তিযোদ্ধা গুলিতে মারা যান এবং কিছু সংখ্যক আহত হন।
৭। প্রশ্ন: দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আপনি কিভাবে দেশে ফিরলেন?
উত্তর: ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে বিভিন্ন জায়গায় পাক সেনারা আত্মসমার্পণ করার পর ঐ দলের সাথে ১৫ ডিসেম্বর আমি খুলনায় আসি। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলেও তখন খুলনা শহর পুরোপুরি হানাদার মুক্ত হতে আরো দুদিন সময় লাগে। এরপর আমি আমার গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসি এবং পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া ইন্দুরকানী এলাকার সকল মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করি।
৮। প্রশ্ন: স্বাধীনতার পর কোন সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে বেশি মূল্যায়ন করেছে এবং সুযোগ সুবিধা দিয়েছে:
উত্তর: দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের রাস্ট্রীয় সম্মান আর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতার স্বপক্ষের সংগঠন আ.লীগ সরকার। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথমে ৩০০ টাকা থেকে ভাতা প্রদান শুরু করে আ.লীগ সরকার। এরপর এই শেখ হাসিনার সরকারই ধাপে ধাপে মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বৃদ্ধি করে দিয়েছে। এখন একজন সাধারন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসে ১২ হাজার টাকা সহ বছরে কয়েকটি উৎসব ভাতা পান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ১২ হাজার থেকে বাড়িয়ে সম্প্রতি ২০ হাজার টাকা করার ঘোষণা দিয়েছেন। আর এটি বাস্তবায়ন এখন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জীবন মানের কথা চিন্তা করে এই ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বর্তমান সরকার। শুধু তাই নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান এমনকি নাতী-নাতনিদের পর্যন্ত সরকারি চাকরির বেলায় ৩০ পারসেন্ট কোঠা নির্ধারণ এবং অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ’বীর নিবাস’ নামে গৃহনির্মাণ করে দিচ্ছেন এ আ.লীগ সরকার। এছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের রাস্ট্রীয় সম্মান এবং অন্যান্য নানা সুযোগ সুবিধাও দিয়েছেন এ সরকার।
৯। প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধকে স্বাধীনতা বিরোধীরা এখনও কোন চোখে দেখছেন বলে আপনার অভিমত:
উত্তর: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে এদেশের রাজাকার, আল বদর, আল-শামস মিলে পাক বাহিনীদের সাথে হাত মিলিয়ে এদেশে নারী নির্যাতন,অগ্নি-সংযোগ গণহত্যা ও লুন্ঠণ চালায়। এদেশের স্বাধীনতা তারা কখনই মেনে নিতে পারেনি। মনে মনে এখনও তারা এবং তাদের অনুসারীরা পাকিস্তানকে লালন করছে। যার কারনে তাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান এখনও স্পস্ট।
১০। প্রশ্ন: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে কোন দেশ সবচেয়ে বেশি সহযোগীতা করেছে?
উত্তর: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি অবদান বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারতের। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাক বাহিনীর অত্যাচার নির্যাতনের মুখে এদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ শরনার্থী হিসেবে পার্র্শ্ববর্তি রাষ্ট্র ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধের জন্য তারা আমাদেরকে অস্ত্র, সৈন্য, খাদ্য ও প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করে। তাদের সহযোগীতা না পেলে আমরা হয়ত স্বাধীনতা অর্জণ করতে পারতামনা।
১১। প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীরা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মানে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনার এ বিষয়ে অভিমত কি?
উত্তর: স্বধীনতার মূল চাবিকাঠিই ছিল বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে। হয়ত বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে এ দেশ স্বাধীন হতনা বা পরাধীনতার শৃংক্ষল থেকে আমরা মুক্ত হতে পারত না। বঙ্গবন্ধুতো একটা অনুভূতি। তার ভাস্কর্য অবশ্যই থাকা উচিত। তিনিতো আমাদের বাঙ্গালী জাতির পিতা। যারা তার ভাস্কর্য নির্মানে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নয় বলে দাবি করেন তিনি।
১২। প্রশ্ন: স্বাধীনতার এই রজত জয়ন্তীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে আপনার প্রত্যাশা কি?
উত্তর: মুক্তিযুদ্ধ যেকোন দেশের জন্য একটি অহংকার। নতুন প্রজন্মকে বেশি বেশি করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে হবে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের অনুভূতিকে মনেপ্রানে লালন করতে হবে। স্বাধীনতা বিরোধীরা যাতে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য নতুন প্রজন্মকে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। সর্বপরি অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এদেশের স্বাধীনতা এবং স্বার্বভৌমত্বকে নতুন প্রজন্ম রক্ষা করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীতে দেশের নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশকে আরো নুতন রুপে চিনবে ও জানবে।





প্রয়োজনে : ০১৭১১-১৩৪৩৫৫
Design By MrHostBD
বাংলা English
Copy link
Powered by Social Snap