সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০১:০৫ পূর্বাহ্ন

২২ মার্চ ভূমিহীন মুক্ত হচ্ছে ইন্দুরকানী উপজেলা; ৭৪ পরিবার পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর

২২ মার্চ ভূমিহীন মুক্ত হচ্ছে ইন্দুরকানী উপজেলা; ৭৪ পরিবার পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর

0 Shares

জে আই লাভলু:
মো: শামীম (৩৮) একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার পৈত্রিক ভিটা যশোর জেলায়। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ায় তার মা ছেলেকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে সংসারী হন। এর পর শামীম একা হয়ে পড়েন। যশোর থেকে ঘুরতে ঘুরতে পরে ইন্দুরকানীর পাড়েরহাটে আসেন তিনি। এরপর নিজের জীবন বাঁচাতে এ বাড়ি ও বাড়ি কামলা কাটেন তিনি। বর্তমানে ভিক্ষাবৃত্তি করে পেট চালান তিনি। ছিন্নমুল এই মানুষটি পাড়েরহাটের হোগলাবুনিয়া গ্রামে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া আশ্রায়নের ঘর পেয়ে তার বাসস্থানের দুর্দশা লাঘব হয়েছে।
একই আশ্রায়নের বাসিন্দা আশি বছর বয়সী বৃদ্ধ আলাতাফ হোসেন। সঙ্গী হিসেবে রয়েছে শুধু তার স্ত্রী হাজেরা বেগম। নি:সন্তান এই পরিবারটি তাদের কোন ছেলে মেয়ে নেই। বয়সের ভারে ন্যুজ আলতাফ হোসেনের বাড়ি মোড়েলগঞ্জ উপজেলায়। ঘর পাওয়ার আগে পথে ঘাটে, হাট বাজারে স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন আর ভিক্ষা করতেন। হোগলাবুনিয়া আশ্রায়নে তাকে একটি ঘর দেয়া হয়েছে। হোগলাবুনিয়া আশ্রায়নে জবেদা বেগম (৬৫) নামে আরেক ভুমিহীন শারীরিক প্রতিবন্ধী নারীও পেয়েছেন আশ্রায়ণ প্রকল্পের ঘর।

আরেক অসহায় নারী শোভা রানী। তার স্বামী ছোট্র একটি চায়ের দেন। আর নিজে মানুষের বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। নি: সন্তান এই দম্পত্তির কোন ছেলে মেয়ে নেই। নিজেদের কোন জায়গা জমি না থাকায় আশ্রায় মিলেছে হোগলাবুনিয়া আশ্রায়নে। খোজ নিয়ে জানা যায়, এখানে মোট ২২টি ছিন্নমূল পরিবার পেয়েছেন আশ্রায়নের ঘর। এদের মধ্যে বেশ কজন ভিক্ষা বৃত্তি করেন। সেফালি বেগম (৫০)। তিন সন্তানের জননী তিনি। গত ১১ বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার স্বামী মারা যান। স্বামীকে হারিয়ে সহায় স্বম্বলহীন সেফালির দু:খ দুর্দশার কোন শেষ ছিলনা। পাড়েরহাট বাজারে বিভিন্ন হোটেল ও বাসাবাড়িতে পানি দিয়ে সংসার চালাতেন। ভুমিহীন সেফালি মুজিববর্ষে পাড়েরহাটে আশ্রায়ণ প্রকল্পের একটি ঘর পাওয়ায় মাথা গোজার ঠাঁই হয় তার। খেয়ে না খেয়েও থাকলেও সন্তানদের নিয়ে বসবাসের মত একটি আশ্রায় হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তার কৃজ্ঞতার শেষ নেই। একই আশ্রায়নের বাসিন্দা চম্পা বেগম (২৫)। দুটি ছেলে রয়েছে তার। স্বামী পেশায় একজন দিনমজুর। নিজেদের কোন জায়গা জমি নেই। প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পেয়ে তার মনে খুশির সীমা নেই।
এভাবেই পশ্চিম বালিপাড়া গ্রামের সালমা বেগম, চাড়াখালী গুচ্ছ গ্রামের ভ্যান চালক স্বপন হাওলাদার, কলারন আশ্রায়ন প্রকল্পে আ: জলিল এবং দেবীপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে ঘর পাওয়া ভূমিহীন ঝুমুর বেগম মত দেশের লাখ লাখ ভূমিহীন ও গৃহহীন ছিন্নমূল অসহায় পরিবার গুলোকে জমি সহ স্থায়ী ঠিকানা গড়ে দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সূত্রে জানা যায়,মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে আশ্রায়ণ প্রকল্পের-২ এর মাধ্যমে দেশের অসহায়, দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবারগুলোকে দেয়া হয়েছে এ গৃহ পুনর্বাসনের সুবিধা। আর এরই ধারাবাহিকতায় পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলায় তিন ধাপে ৬৩০ জন ভূমিহীন পরিবার পেয়েছেন আশ্রায়ণ প্রকল্পের ঘর। নির্মাণাধীন আরো ২১৪ টি ঘরের মধ্যে ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া চতুর্থ ধাপে এ উপজেলার ৭৪ টি পরিবার পাচ্ছেন আগামী ২২ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর। এর মধ্যে পাড়েরহাট ইউনিয়নে ৪৫টি, পত্তাশী ইউনিয়নে ১৪ টি এবং চন্ডিপুর ইউনিয়নে ১৫ টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। দুই শতক খাস জমির উপর নির্মিত হওয়া এ ঘরের সামনে বারান্দা, রান্নাঘর, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি ল্যাট্রিন, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা সহ দুই কক্ষ বিশিষ্ট রঙিন টিনের চাউনিতে ইটের দেয়ালে ঘেরা আধাপাকা বাড়ি ঐদিন উপকারভোগীদের মাঝে হস্তান্তর করা হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐদিন ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জমির মালিকানা সহ ঘরগুলোর হস্তান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন ও পিরোজপুর জেলা সহ এ উপজেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ক’ শ্রেণীর ভূমিহীন ও গৃহহীন মুক্ত ঘোষণা করবেন।
সরেজমিনে উপজেলার ইন্দুরকানী সদর, চন্ডিপুর, বালিপাড়া, পত্তাশী ও পারেরহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা গেছে, সময়ের সাথে বদলেছে আশ্রায়ণে ঘর পাওয়া ছিন্নমূল মানুষের যাপিত জীবন। ভিটেু-মাটিহীন ছিন্নমূল মানুষগুলো এখন বসবাস করছে রঙিন টিন আর পাকা দেয়ালের আধাপাকা বাড়িতে। সেই বাড়িতেই ব্যক্তি উদ্যোগে করছেন শাক-সবজির আবাদ। কেউবা করছে হাঁস-মুরগি পালন। আবার কেউ কেউ হস্ত শিল্প, সেলাই কাজসহ নানা কর্মমূখি কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। সন্তানদের পাঠাচ্ছেন স্কুলে। বসতির দুশ্চিন্তা ছেড়ে নিশ্চিন্ত মনে কাজ করে এগিয়ে নিচ্ছে সংসার। সংসারে এসেছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা। বসবাসের জন্য সরকারের দেওয়া এই ঘর পেয়ে খুশি আশ্রয়হীন মানুষগুলো। লাল সবুজের রঙিন টিনের আধাপাকা ঘর পেয়ে এখন রঙিন স্বপ্ন বুনছেন তারা। চলছে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা।

আশ্রয়নে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সহ সব ধরনের সহায়তা ও পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরকেও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে নানা ধরনের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ। এছাড়া আশ্রায়নের বাসিন্দারা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাচ্ছেন সরকারের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা।
হোগলাবুনিয়া আশ্রায়ণ প্রকল্পে মাথা গোজার ঠাঁই হওয়া ভূমিহীন শোভারানী,ভিক্ষুক আলতাফ হোসেন,শারীরিক প্রতিবন্ধী জবেদা বেগম ভিক্ষুক শামীম, কলারন আশ্রায়ন প্রকল্পের বৃদ্ধ সালাম গাজী, চাড়াখালী গুচ্ছগ্রামের ভ্যান চালক স্বপন হাওলাদার, দেবীপুর আশ্রয়ন প্রকল্পে ঘর পাওয়া ভূমিহীন ঝুমুর বেগম, পশ্চিম বালিপাড়ার সালমা, কলারনের জলিল জোমাদ্দার,কচা নদীর পাড়ে পারেরহাটের আশ্রায়ণ প্রকল্পের চম্পা বেগম, বিধবা শেফালী বেগমের মত অনেকের চোখে মুখে এখন খুশির ঝিলিক। প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে তারা পেয়েছেন আপন নিবাস। মাস ছয়েক আগেও ভাবেননি এমন একটা সুন্দর মাথা গোজার ঠাঁই হবে তাদের। যেখানে হবে তাদের একটা স্থায়া ঠিকানা। তাদের কাছে সত্যিই এটা স্বপ্নের মত। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই তাদের। তাই সৃষ্টিকর্তার কাছে এসব অসহায় আশ্রায়হীন মানুষদের ঠিকানা গড়ে দেয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করছেন সবাই।

১নং পাড়েরহাট ইউপি চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান শাওন বলেন দেশের লাখ লাখ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে গৃহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা সত্যিই বিশে^র ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমি বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ জানাই।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: শফিকুল ইসলাম বলেন, কাজের গুনগত মান ঠিক রেখে এ উপজেলায় আশ্রায়ণ প্রকল্পের ঘর গুলো আমরা সঠিক ভাবে নির্মান ও উপকারভোগীদের সার্বিক সুযোগ সুবিধা প্রদান করার চেস্টা করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে আমরা এর সাথে সংশ্লিস্ট সবাই দিন রাত পরিশ্রম করেছি।

ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী অফিসার লুৎফুন্নেসা খানম বলেন, ‘দেশের একজন মানুষও ভূমিহীন ও গৃহহীন থাকবেনা’ মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন ঘোষণা বাস্তবায়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে ইন্দুরকানী উপজেলা প্রশাসন। উপজেলার ৫ ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উপহার আশ্রয়ন-২ প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ৬৩০টি পরিবারের জন্য রঙিন পাকা ঘর নির্মাণ শেষে উপকার ভোগীদের মাঝে হস্তান্তর করা হয়েছে। আগামী ২২ মার্চ আরো ৭৪টি ভূমিহীন পরিবারকে আমরা জমি সহ ঘর হস্তান্তর করব। এছাড়া এ উপজেলায় ১৪০টি ঘর নির্মানাধীন অবস্থায় রয়েছে। নির্মান কাজ সম্পন্ন হলে ঘর গুলো হস্তান্তর করা হবে।

এ প্রসঙ্গে ইন্দুরকানী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এ্যাড. এম মতিউর রহমান বলেন, গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আ.লীগ সরকরের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল দেশের একটি পরিবারও ভূমিহীন ও গৃহহীন থাকবেনা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশের ভুমিহীন ছিন্নমূল পরিবার গুলোর মাথা গুজোর ঠাঁই করে দিয়েছেন। এই প্রকল্প বর্তমান আ.লীগ সরকারের একটি রোল মডেল কারণ এভাবে বিশে^র আর কোন দেশে আশ্রয়হীনদের জন্য সরকারিভাবে নিরাপদ ছাদ তৈরির ব্যবস্থা হয়নি।





প্রয়োজনে : ০১৭১১-১৩৪৩৫৫
Design By MrHostBD
Copy link
Powered by Social Snap